সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী, ২০২৬: দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার সুরক্ষায় নতুন বিধান

দ্যা ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২ বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ বাংলাদেশে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের মূল আইনি কাঠামো হিসেবে দীর্ঘদিন কার্যকর রয়েছে। এই আইনের অধীনে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কেউ কোনো সম্পত্তি দান করলে দানের সাথে সাথেই তার মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত হয়ে যায়। বাস্তবে এই বিধানের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের নামে জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেওয়া বাবা-মা পরবর্তী জীবনে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়ে যান, কারণ একবার নিবন্ধিত দান আইনগতভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

এই বাস্তব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ শীর্ষক একটি বিল উত্থাপিত হয়, যার মাধ্যমে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনীটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিলে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত: বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা

সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মো. আব্দুল মোনায়েমের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। নিঃসন্তান মোনায়েম তার ১১৫ শতাংশ জমির কিছু অংশ মুসলিম আইনের ”হেবা” বিধানের অধীনে তার এক ভাইকে লিখে দিয়েছিলেন। হেবার বিধান অনুযায়ী দাতা জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান করতে পারেন, কিন্তু পরবর্তীতে যখন তিনি অন্য এক ভাইয়ের সন্তানকে সম্পত্তির কিছু অংশ দিতে চাইলেন, তখন জানতে পারলেন যে সম্পূর্ণ সম্পত্তিই ওই ভাই ইতিমধ্যে নিজের নামে নিবন্ধন করে নিয়েছেন। এই বিরোধের জের ধরে সৃষ্ট পারিবারিক কলহে তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, এবং হেবার ঘোষণা বাতিল করার আইনগত সুযোগ না থাকায় বর্তমানে তিনি কার্যত উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছেন।

সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ধরনের ঘটনা বিদ্যমান আইনি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে — জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও দাতার নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কোনো আইনি নিশ্চয়তা ছিল না।

সংশোধনীর মূল বিষয়বস্তু: নতুন ধারা ১২২এ ও ১২২বি

সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ ধারায় দুটি নতুন উপধারা-১২২এ এবং ১২২বি- সংযোজন করা হয়েছে।

১২২এ ধারা: লাইফটাইম ইউজুফ্রাক্ট রাইট বা আজীবন ভোগদখলের অধিকার

নতুন সংযোজিত বিধান অনুযায়ী, এই আইনে বা প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, দাতা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার বা লাইফটাইম ইউজুফ্রাক্ট রাইটস সংরক্ষিত রেখে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করা সম্পূর্ণ আইনসিদ্ধ হবে।

এই সুবিধা তবে সর্বজনীন নয়। ধারা ১২২এ(২)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই দান কেবল নিম্নলিখিত সম্পর্কের মধ্যেই বৈধ হবে:

পিতা-মাতা থেকে সন্তান (বা এর বিপরীতক্রমে);

দাদা-দাদি বা নানা-নানি থেকে নাতি-নাতনি (বা এর বিপরীতক্রমে); এবং

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই দান রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ১৭(১)(ক) অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ঘোষণা করে সম্পন্ন করতে হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মৃত্যুবরণ করলেও দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে; এমন পরিস্থিতিতে সম্পত্তি প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।

আইনটিতে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই ধারার অধীনে সম্পাদিত হস্তান্তর সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এই আইন বা অন্য কোনো প্রচলিত আইনের অধীনে স্বীকৃত দান, হেবা বা অন্য কোনো হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে সীমিত বা ক্ষুণ্ন করবে না।

১২২বি ধারা: দান বাতিল বা পরিবর্তনের বিধান

দাতার ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষিত রেখে সম্পাদিত দান কীভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করা যাবে, তা ১২২বি ধারায় নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ নিয়ম হলো, একবার নিবন্ধিত দান আর বাতিল করা যাবে না। তবে নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এই দান বাতিল বা পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে:

১. পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে: কোনো আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত, পারিবারিক বা অন্য কোনো বাস্তব ও জরুরি প্রয়োজনে দাতা এবং গ্রহীতা উভয়ে পারস্পরিক সম্মতিতে একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন, বাতিল বা এর সাথে সম্পর্কিত অধিকার রদবদল করতে পারবেন।

২. জেলা জজের অনুমতিক্রমে:যদি পক্ষগণের মধ্যে কারো বয়স কম থাকা, নিখোঁজ হওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, আইনগত অযোগ্যতা বা অন্য কোনো পর্যাপ্ত কারণে সম্মতি গ্রহণ সম্ভব না হয়, তবে অপর পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ দানের অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা রদবদলের অনুমতি প্রদান করতে পারবেন।

জেলা জজের এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত সুরক্ষাও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো আদেশ প্রদানের পূর্বে জেলা জজকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিকে যথাযথ নোটিশ প্রদান করতে হবে, প্রয়োজনবোধে তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে এবং আবেদনটি সরল বিশ্বাসে বা সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে।

কন্যা সন্তান ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত প্রভাব

এই সংশোধনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক প্রভাব দেখা যায় সেসব পরিবারের ক্ষেত্রে, যেখানে কেবল কন্যা সন্তান রয়েছে। প্রচলিত উত্তরাধিকার আইনে শরীয়াহ বিধান অনুসরণ করা হয়, যেখানে একজন কন্যা সন্তান একাই পিতার সম্পূর্ণ সম্পত্তির মালিক হতে পারেন না  সম্পত্তির একটি অংশ অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যায়। একইভাবে হিন্দু ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী নারীরা জীবনস্বত্বে সম্পত্তির শুধু ভোগদখলের অধিকার পান, সম্পূর্ণ মালিকানা পান না।

নতুন সংশোধনীর ফলে যাদের কেবল কন্যা সন্তান রয়েছে, তারা এখন তাদের সন্তানদের নামে সম্পত্তি দান করতে পারবেন এবং সেই সঙ্গে নিজের জীবদ্দশায় তা ভোগদখল করার অধিকারও বজায় রাখতে পারবেন। এর ফলে একজন পিতা বা মাতা তার জীবনভর কষ্টার্জিত সম্পত্তি সঠিক ব্যক্তির কাছে যাওয়ার নিশ্চয়তা পান, আবার নিজের বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তাও অক্ষুণ্ন থাকে।

পর্যবেক্ষণ ও তাৎপর্য

সংশোধনীটির মূল আইনি তাৎপর্য এই যে, এটি সম্পত্তি হস্তান্তর ও দাতার স্বার্থ সুরক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় দান ও ভোগদখলের অধিকার একই সঙ্গে হস্তান্তরিত হওয়ার বিধানটি ছিল অনেকাংশে অপরিবর্তনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ । বিশেষত পিতা-মাতার জন্য, যারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজেদের বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা বিসর্জন দিতেন। নতুন বিধানের ফলে দাতা মৃত্যুর আগে ও পরে – দুই ক্ষেত্রেই আইনগত নিশ্চয়তা পাচ্ছেন: জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগদখলের অধিকার এবং মৃত্যুর পরে সম্পত্তি যথাযথ ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের নিশ্চয়তা।

তবে সংশোধনীর প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাগুলোও লক্ষণীয়। এই সুবিধা কেবল নির্দিষ্ট পরিবারিক সম্পর্কের মধ্যেই (পিতা-মাতা, সন্তান, দাদা-দাদি/নানা-নানি-নাতি-নাতনি, স্বামী-স্ত্রী) প্রযোজ্য, এবং স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের শর্ত পালন করতে হবে। একইসঙ্গে, দান বাতিল বা পরিবর্তনের সুযোগ যথেষ্ট সীমিত ও শর্তাধীন রাখা হয়েছে, যাতে দানের স্থিতিশীলতা ও গ্রহীতার আইনগত নিরাপত্তাও বিঘ্নিত না হয়।

ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার প্রয়াস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সংযোজিত ধারা ১২২এ ও ১২২বি-র মাধ্যমে দাতাগণ – বিশেষত বয়োজ্যেষ্ঠ বাবা-মা এবং কন্যা-সন্তান-অধিকারী পরিবারগুলো  এখন জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান করেও নিজের ভোগদখলের অধিকার বজায় রাখতে পারবেন, যা তাদের আইনগত ও ব্যবহারিক সুরক্ষা উভয় দিক থেকেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। যেকোনো পক্ষের জন্য এই বিধানের অধীনে দান সম্পাদনের পূর্বে নিবন্ধন প্রক্রিয়া, সম্পর্কের যোগ্যতা এবং দলিলের শর্তাবলী সম্পর্কে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া সমীচীন হবে।

এই আর্টিকেলটি সাধারণ আইনগত তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রণীত এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পেশাগত আইনি পরামর্শের বিকল্প নয়। নির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *