ভূমিকা: DNA টেস্ট কী

DNA (Deoxyribonucleic Acid) হলো মানবদেহের প্রতিটি কোষে থাকা এক ধরনের জেনেটিক উপাদান, যা প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে অনন্য (একই ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেওয়া যমজ ব্যতীত)। DNA টেস্ট বা DNA প্রোফাইলিং হলো একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে রক্ত, চুল, লালা, ত্বকের কোষ বা শরীরের অন্য কোনো নমুনা থেকে একজন ব্যক্তির জেনেটিক পরিচয় শনাক্ত করা হয় এবং তা অন্য একজনের সঙ্গে তুলনা করে জৈবিক সম্পর্ক বা পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।

সন্তান যেহেতু পিতা-মাতা উভয়ের কাছ থেকে সমান অনুপাতে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য পায়, তাই সন্তান ও অভিভাবকের DNA নমুনা পাওয়া গেলে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ণয় প্রায় নিশ্চিতভাবে করা সম্ভব। এই বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতার কারণেই আধুনিক আইনি ব্যবস্থায় DNA প্রমাণকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে।

DNA প্রোফাইলিংয়ের ব্যবহারক্ষেত্র

বাংলাদেশে DNA পরীক্ষা মূলত নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়:

I. ফৌজদারি তদন্ত: ধর্ষণ, হত্যা, শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্তকরণ

II. পিতৃত্ব/মাতৃত্ব নির্ণয়: পারিবারিক মামলায় সন্তানের বংশপরিচয় নিশ্চিতকরণ

III. নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাতপরিচয় লাশ শনাক্তকরণ: দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ

IV. মানব পাচার মামলা:  ভিকটিম ও পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক যাচাই

বাংলাদেশের আইনি কাঠামো

১. Deoxyribonucleic Acid (DNA) Act, 2014 (Act No. X of 2014)

বাংলাদেশে DNA সংক্রান্ত প্রথম ও প্রধান আইন হলো ডিএনএ আইন, ২০১৪। এই আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো DNA নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা, DNA নমুনা ও প্রোফাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং ফরেনসিক DNA ল্যাবরেটরি ও একটি জাতীয় DNA ডেটাবেজ প্রতিষ্ঠা করা। এই আইনকে বাংলাদেশে DNA প্রমাণ সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রথম সম্পূর্ণাঙ্গ আইন হিসেবে গণ্য করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ:

ধারা ৪: তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা কোনো অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছে DNA নমুনা প্রদানের অনুরোধ জানাতে পারেন। সন্দেহভাজন ব্যক্তি নাবালক অথবা শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী হলে তার আইনগত অভিভাবকের কাছে নমুনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়।

ধারা ৫: অপরাধস্থল থেকে প্রাপ্ত যেকোনো আলামত থেকে DNA নমুনা সংগ্রহের বিধান রয়েছে।

ধারা ৬: এটি আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষামূলক বিধান-

সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা তার আইনগত অভিভাবকের লিখিত সম্মতি এবং কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া কোনো DNA নমুনা সংগ্রহ করা যাবে না।

ধারা ৭: ধারা ৪ অনুযায়ী অনুরোধ করার পর ৩ ঘণ্টার মধ্যে সাড়া না পাওয়া গেলে তা অসম্মতি হিসেবে গণ্য হবে এবং নির্ধারিত ফরমে তা রেকর্ড আকারে সংরক্ষণ করতে হবে।

শাস্তির বিধান:

আইনটিতে DNA-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে-

DNA নমুনা নষ্ট, পরিবর্তন বা দূষিত করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা (ধারা-৩০)

অবৈধভাবে ফরেনসিক DNA কার্যক্রম পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা (ধারা-২৮)

অবৈধভাবে নমুনা সংগ্রহ বা DNA সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা (ধারা-২৯)

জাতীয় DNA ডেটাবেজে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা (ধারা-৩১)

কোম্পানির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে, অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে দায়ী গণ্য করার বিধানও আইনে রয়েছে। (ধারা-৩২)

জাতীয় DNA ডেটাবেজ ও উপদেষ্টা কমিটি:

আইনের অধীনে সরকার একটি জাতীয় DNA ডেটাবেজ প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে DNA প্রোফাইলিং সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। এই কার্যক্রম তদারকির জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

২. Deoxyribonucleic Acid (DNA) Rules, 2018

DNA আইন, ২০১৪-এর বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তীতে DNA বিধিমালা, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিমালায় নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ল্যাবরেটরি পরিচালনার খুঁটিনাটি প্রক্রিয়াগত দিকনির্দেশনা রয়েছে।

৩. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (Evidence Act, 1872)

DNA রিপোর্টের আদালতে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে সাক্ষ্য আইনের ধারা ৪৫ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধারার আওতায় বিজ্ঞান, বিদেশি আইন, হস্তলিপি বা আঙুলের ছাপ বিশেষজ্ঞের মতামত সাধারণত অগ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় ফরেনসিক প্রমাণ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে এটিই মূল আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, DNA প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো পৃথক বিধান সাক্ষ্য আইনে নেই । এটি মূলত বিশেষজ্ঞ মতামতের সাধারণ কাঠামোর মধ্য দিয়েই আদালতে উপস্থাপিত হয়।

৪. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure)

DNA আইন, ২০১৪ অনুসারে, এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধের অভিযোগ দায়ের, তদন্ত পরিচালনা, বিচার এবং আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর বিধানসমূহ প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ DNA আইন একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতিগত কাঠামো তৈরি না করে বিদ্যমান ফৌজদারি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করে।

৫. মুসলিম পারিবারিক আইন ও পিতৃত্ব নির্ণয়

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইনে ঐতিহ্যগতভাবে পিতৃত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিবাহের বৈধতা, “ফেরাশ” (বিছানার নীতি) এবং স্বীকৃতির নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমসাময়িক ইসলামি আইনি আলোচনায় DNA পরীক্ষাকে একটি কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, এটিকে শরীয়াহভিত্তিক পদ্ধতির সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে মত দেওয়া হয় । ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত পিতৃত্বের সম্পর্ক যাচাইয়ের জন্য নয়, বরং মূলত বিতর্কিত ও অমীমাংসিত ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশে পারিবারিক আদালতে পিতৃত্ব-সংক্রান্ত বিরোধে DNA টেস্টের প্রাসঙ্গিকতা এই সাধারণ নীতির আলোকেই বিবেচিত হয়ে থাকে।

নমুনা সংগ্রহের বৈধ প্রক্রিয়া

DNA আইন, ২০১৪ অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়:

১। তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্দেহভাজন বা অভিযুক্তের কাছে নমুনা প্রদানের অনুরোধ জানাবেন (ধারা ৪)

২। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির লিখিত সম্মতি ও কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক (ধারা ৬)

৩। অনুরোধের ৩ ঘণ্টার মধ্যে সাড়া না দিলে তা অসম্মতি হিসেবে রেকর্ড করা হবে (ধারা ৭)

৪। নাবালক বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনগত অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন (ধারা ৪)

আইনজীবী মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাধারণভাবে DNA পরীক্ষা ইচ্ছামতো বা যথেচ্ছভাবে করা যায় না । এটি নির্দিষ্ট আইনি ও পদ্ধতিগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়, এবং সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি আবশ্যক। তবে ফৌজদারি তদন্ত বা আদালতের নির্দেশনার ক্ষেত্রে বৈধ কর্তৃত্ববলে সম্মতি ছাড়াও নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব।

অধিকার ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ

DNA আইনি কাঠামোর বাস্তবায়নে বাংলাদেশে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:

১। গোপনীয়তার অধিকার বনাম তদন্তের প্রয়োজন:

DNA তথ্য অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল হওয়ায় এর সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গোপনীয়তার অধিকার রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। যদিও আইনে ডেটাবেজের গোপনীয়তা রক্ষার বিধান আছে, বাস্তব প্রয়োগে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

২। নমুনা বিশ্লেষণে জট:

বিশেষত ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অপরাধস্থল থেকে সংগৃহীত বিপুল সংখ্যক অবিশ্লেষিত DNA নমুনা ও জৈবিক আলামতের ব্যাকলগ ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

৩। ল্যাব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা:

পর্যাপ্ত সংখ্যক ফরেনসিক DNA ল্যাবরেটরি ও দক্ষ জনবলের অভাব পরীক্ষার সময়ক্ষেপণ ও নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

৪। সচেতনতার অভাব:

আইনি সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষের মধ্যে DNA আইনের বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকায় এর সুষ্ঠু প্রয়োগ ব্যাহত হয়।

Deoxyribonucleic Acid (DNA) Act, 2014 বাংলাদেশের ফৌজদারি ও পারিবারিক বিচার ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা প্রথমবারের মতো DNA প্রমাণ সংগ্রহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রদান করেছে। সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সমন্বয় করে এই আইন অপরাধ তদন্ত, পিতৃত্ব নির্ণয় ও ব্যক্তি শনাক্তকরণে বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা যোগ করেছে। তবে ল্যাব অবকাঠামো, নমুনা বিশ্লেষণের জট এবং গোপনীয়তা রক্ষার প্রায়োগিক দিকগুলোতে আরও সংস্কার প্রয়োজন, যাতে এই আইন তার প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জন করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *